## শরীয়তপুরে রাতে বাড়ি ফেরার পথে ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে জখম, পেট্রল ঢেলে শরীরে আগুন: এক নৃশংসতার উপাখ্যান
রাত গভীর হওয়ার সাথে সাথে যখন সবাই দিনের কাজ শেষে ঘরে ফেরার প্রস্তুতি নেন, তখনো কিছু মানুষ তাঁদের জীবিকার সন্ধানে ব্যস্ত থাকেন। কিন্তু কখনো কখনো সেই পথে নেমে আসে ভয়াবহ বিপদ। এমনই এক পৈশাচিক হামলার শিকার হয়েছেন শরীয়তপুরের ডামুড্যা উপজেলার এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। গতকাল বুধবার রাতে বাড়ি ফেরার পথে দুর্বৃত্তরা তাঁকে কুপিয়ে জখম করেছে এবং আরও ভয়ংকরভাবে তাঁর শরীরে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। এই লোমহর্ষক ঘটনা শুধু একটি অপরাধ নয়, এটি সমাজের অস্থিরতা ও নিরাপত্তার প্রশ্নকেও সামনে নিয়ে আসে।
**কী ঘটেছিল সেই রাতে?**
ডামুড্যা থানার কনেশ্বর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের তিলই গ্রামের বাসিন্দা পরেশ চন্দ্র দাসের ছেলে খোকন চন্দ্র দাস, যিনি কেউরভাঙ্গা বাজারে ওষুধের দোকান ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ব্যবসা করেন। প্রতিদিনের মতো গতকাল বুধবার রাতে দোকান বন্ধ করে সারা দিনের বিক্রির টাকা নিয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে বাড়ি ফিরছিলেন তিনি। ডামুড্যা-শরীয়তপুর সড়কের কেউরভাঙ্গা বাজারের অদূরেই এই লোমহর্ষক ঘটনা ঘটে।
দুর্বৃত্তরা তাঁর অটোরিকশা থামিয়ে প্রথমে তাঁকে বেদম মারধর করে। এরপর ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাঁকে এলোপাতাড়ি কোপানো হয়। আক্রমণ এখানেই শেষ হয়নি, পাষণ্ডরা এরপর তাঁর মাথায় পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। মৃত্যুর মুখ থেকে বাঁচতে তিনি পাশের একটি পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তাঁর চিৎকারে আশপাশের লোকজন ছুটে এলে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়।
**গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে ও ঢাকায় প্রেরণ**
স্থানীয় লোকজন দ্রুত খোকন চন্দ্র দাসকে উদ্ধার করে রাত ১০টার দিকে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। জরুরি বিভাগের চিকিৎসক নজরুল ইসলাম জানান, খোকন দাসের শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন রয়েছে, বিশেষ করে পেটের একটি আঘাত মারাত্মক। এছাড়াও তাঁর মুখমণ্ডল, মাথার পেছনে ও হাতে আগুনে পোড়া ক্ষত রয়েছে। প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর তাঁর অবস্থার অবনতি হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে রাতেই ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
**স্ত্রীর প্রশ্ন: শত্রুতা না থাকা সত্ত্বেও কেন এই হামলা?**
আহত খোকন দাসের স্ত্রী সীমা দাসের কথায় উঠে এসেছে এক বুক হতাশা ও প্রশ্ন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার স্বামী প্রতিদিন রাতে দোকান বন্ধ করে সারা দিনের বিক্রির টাকা নিয়ে বাড়িতে ফেরেন। বুধবার রাতে সন্ত্রাসীরা তাঁর ওপর হামলা করে। তিনি হামলাকারীদের দুজনকে চিনে ফেলেছিলেন, যার কারণে তারা তাঁকে হত্যার উদ্দেশ্যে কুপিয়েছে, মাথায় ও মুখমণ্ডলে পেট্রল দিয়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। এলাকায় আমাদের কোনো শত্রু নেই। কোনো বিষয় নিয়ে কারও সঙ্গে বিরোধ নেই। কেন সন্ত্রাসীরা হঠাৎ করে আমার স্বামীকে নিশানা করে আক্রমণ করল, আমরা তা বুঝতে পারছি না।’ স্ত্রীর এই কথায় ফুটে উঠেছে এক অসহায় পরিবারের তীব্র আকুতি।
**পুলিশের তৎপরতা: দুই হামলাকারী চিহ্নিত**
এই জঘন্য ঘটনার পর নড়েচড়ে বসেছে স্থানীয় প্রশাসন। ডামুড্যা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রবিউল হক প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, কেউরভাঙ্গা বাজারের এক ব্যবসায়ীর ওপর সন্ত্রাসী হামলার খবর পেয়েই পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। ইতিমধ্যেই হামলাকারীদের মধ্যে দুজনের নাম জানা গেছে – তাঁরা হলেন স্থানীয় রাব্বি ও সোহাগ। তাঁদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে এবং এ ঘটনায় আরও কারা জড়িত, তাদেরও শনাক্ত করার চেষ্টা অব্যাহত আছে।
**আমাদের ভাবনা**
একের পর এক এমন নৃশংস ঘটনা সমাজের অস্থিরতার চিত্র তুলে ধরে। একজন সাধারণ ব্যবসায়ী যিনি প্রতিদিন সততার সাথে জীবিকা নির্বাহ করেন, তাঁর উপর এমন পৈশাচিক হামলা সত্যিই নিন্দনীয়। আমরা চাই, এই ঘটনার দ্রুত বিচার হোক এবং অপরাধীরা আইনের আওতায় আসুক। পাশাপাশি, প্রত্যন্ত অঞ্চলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আরও তৎপর হবে – এটাই সবার প্রত্যাশা। খোকন চন্দ্র দাসের দ্রুত সুস্থতা কামনা করছি এবং আশা করি তাঁর পরিবার এই কঠিন সময়ে ন্যায়বিচার পাবে।


