ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র তার জাতীয় প্রতিরক্ষা কৌশলে একটি বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। সম্প্রতি প্রকাশিত নতুন কৌশলগত নথি অনুসারে, মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ এখন চীনকে তার প্রাথমিক উদ্বেগ হিসেবে বিবেচনা না করে, বরং মার্কিন মাতৃভূমি এবং পশ্চিম গোলার্ধের নিরাপত্তাকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছে। এই পরিবর্তন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে, এবং প্রশ্ন উঠেছে, এর ফলে চীন ও রাশিয়ার মতো পরাশক্তিগুলোর অবস্থান ও কৌশলগত ভাবনা কী হতে পারে?
### কেন এই কৌশলগত পরিবর্তন?
দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন প্রতিরক্ষা কৌশল চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবকে মোকাবিলা করার ওপর জোর দিয়ে আসছিল। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের সামরিক সম্প্রসারণ, তাইওয়ান প্রণালীতে উত্তেজনা এবং সাইবার হামলা সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে চীনের আগ্রাসী নীতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে গভীরভাবে চিন্তিত করেছিল। তবে, সাম্প্রতিক নথিতে এই অগ্রাধিকার পরিবর্তনের কারণগুলো বেশ গভীর।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই পরিবর্তনের পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ কাজ করছে:
* **মাতৃভূমির নিরাপত্তা:** সাইবার হামলা, সন্ত্রাসবাদ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং মহামারীর মতো আধুনিক হুমকিগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব ভূখণ্ডে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। এছাড়া, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ এবং ড্রাগ পাচারের মতো বিষয়গুলোও পশ্চিম গোলার্ধের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলাকে এখন প্রধান কাজ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
* **সম্পদের পুনর্বন্টন:** চীনকে প্রাথমিক প্রতিযোগী হিসেবে চিহ্নিত করলে ব্যাপক সামরিক বিনিয়োগ এবং নির্দিষ্ট অঞ্চলে মনোযোগের প্রয়োজন হয়। নতুন কৌশল অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পর আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আরও কার্যকরভাবে শক্তি প্রয়োগ সম্ভব হবে।
* **ভিন্ন ধরনের হুমকি:** যদিও চীন একটি দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত চ্যালেঞ্জ, রাশিয়া এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তিগুলো তাৎক্ষণিক এবং প্রত্যক্ষ হুমকি সৃষ্টি করতে পারে, বিশেষ করে ইউরোপে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেশী অঞ্চলগুলোতে।
### চীন কি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে?
মার্কিন প্রতিরক্ষা কৌশলে চীনকে প্রাথমিক উদ্বেগের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার অর্থ এই নয় যে, যুক্তরাষ্ট্র আর চীনের দিকে নজর রাখছে না। বরং এর অর্থ হতে পারে, চীনকে মোকাবিলা করার কৌশল ভিন্ন পথে পরিচালিত হবে।
* **কম সরাসরি সংঘাতের চাপ:** চীনের ওপর থেকে হয়তো সরাসরি সামরিক সংঘাতের চাপ কিছুটা কমতে পারে, যা চীনকে তার অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারে আরও মনোযোগ দিতে সাহায্য করবে।
* **কূটনৈতিক এবং অর্থনৈতিক চাপ:** যুক্তরাষ্ট্র হয়তো সামরিক শক্তির পরিবর্তে কূটনৈতিক জোট, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা ব্যবহার করে চীনের প্রভাব মোকাবিলা করবে। এটি চীনকে একরকম স্বস্তি দিলেও, দীর্ঘমেয়াদী চ্যালেঞ্জগুলো থেকেই যাবে।
* **সামরিক আধুনিকীকরণ অব্যাহত:** চীন সম্ভবত তার সামরিক আধুনিকীকরণের প্রক্রিয়া আরও দ্রুতগতিতে চালিয়ে যাবে, কারণ তারা মনে করতে পারে, এই সুযোগে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা আরও বাড়াতে হবে।
তবে, এটাও মনে রাখা জরুরি যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহার করবে না। বরং, মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে অংশীদারিত্ব জোরদার করে চীনকে ঘিরে রাখার কৌশল অব্যাহত থাকতে পারে।
### রাশিয়ার অবস্থান কী?
ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষিতে রাশিয়া ইতিমধ্যেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটোর কাছে একটি বড় হুমকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা কৌশলে মাতৃভূমি এবং পশ্চিম গোলার্ধের ওপর জোর দেওয়ার ফলে রাশিয়ার ওপর পরোক্ষভাবে কী প্রভাব পড়তে পারে?
* **ইউরোপে মনোযোগ বৃদ্ধি:** যদি যুক্তরাষ্ট্র তার পশ্চিম গোলার নিরাপত্তার ওপর বেশি জোর দেয়, তাহলে রাশিয়ার দিক থেকে ইউরোপের দেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ন্যাটোর ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপে তার সামরিক উপস্থিতি এবং সহায়তা অব্যাহত রাখবে।
* **আর্কটিক অঞ্চলে প্রতিযোগিতা:** পশ্চিম গোলার্ধের নিরাপত্তার মধ্যে আর্কটিক অঞ্চলও পড়ে। এই অঞ্চলে রাশিয়া এবং চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র উদ্বিগ্ন। নতুন কৌশল অনুযায়ী, আর্কটিক অঞ্চলে মার্কিন নজরদারি ও সামরিক তৎপরতা বাড়তে পারে।
* **দ্বৈত চ্যালেঞ্জ:** রাশিয়া এবং চীন উভয়ের সঙ্গেই যুক্তরাষ্ট্রকে মোকাবিলা করতে হবে। তবে, রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক সম্ভবত আরও সংঘাতপূর্ণ এবং তাৎক্ষণিক হুমকি হিসেবে বিবেচিত হবে, যেখানে চীনকে দেখা হবে দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত প্রতিযোগী হিসেবে।
### বৈশ্বিক প্রভাব
এই কৌশলগত পরিবর্তনের বৈশ্বিক প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে। এশিয়ার মিত্রদেশগুলো, যেমন জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং অস্ট্রেলিয়া, হয়তো তাদের নিরাপত্তা নিয়ে কিছুটা চিন্তিত হতে পারে, যদিও যুক্তরাষ্ট্র তাদের আশ্বস্ত করবে যে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা তাদের কাছে এখনও গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকার মতো অঞ্চলগুলোতে মার্কিন নীতিতে পরিবর্তন আসতে পারে, যেখানে তারা স্থানীয় অংশীদারদের ওপর আরও বেশি নির্ভর করতে পারে।
সব মিলিয়ে, মার্কিন জাতীয় প্রতিরক্ষা কৌশলে এই পরিবর্তন বিশ্বজুড়ে ক্ষমতা ও প্রভাবের ভারসাম্যে একটি নতুন অধ্যায় সূচিত করছে। এটি কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজেদের হুমকির ধারণাকেই নয়, বরং বিশ্বজুড়ে অন্যান্য দেশগুলোর কৌশলগত পরিকল্পনাকেও প্রভাবিত করবে। ভবিষ্যৎই বলে দেবে, এই নতুন পথ কতটা কার্যকর প্রমাণিত হয়।



