ভূমিকম্পের সময় কী করবেন, কী করবেন না: জীবন বাঁচাতে জানুন জরুরি করণীয়!
ভূমিকম্প একটি অপ্রত্যাশিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ যা অল্প সময়েই ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটাতে পারে। বাংলাদেশ একটি ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায়, আমাদের সবারই ভূমিকম্প চলাকালীন এবং এর আগে-পরে কী করা উচিত এবং কী করা উচিত নয়, তা জানা অত্যন্ত জরুরি। সঠিক প্রস্তুতি ও সচেতনতা আপনার জীবন এবং আপনার প্রিয়জনদের জীবন বাঁচাতে সাহায্য করতে পারে।
চলুন জেনে নিই, ভূমিকম্পের সময় আপনার করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়গুলো।
### ভূমিকম্পের আগে: আপনার প্রস্তুতিই অর্ধেক যুদ্ধ জয়
ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব নয়, তবে প্রস্তুতি নিলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমানো যায়।
**করণীয়:**
1. **জরুরি কিট প্রস্তুত রাখুন:** একটি সহজে বহনযোগ্য ব্যাগে প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম, শুকনো খাবার, পর্যাপ্ত পানি, টর্চলাইট, ব্যাটারিচালিত রেডিও, অতিরিক্ত ব্যাটারি, হুইসেল, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও কিছু নগদ টাকা গুছিয়ে রাখুন।
2. **পারিবারিক দুর্যোগ পরিকল্পনা:** পরিবারের সবার সাথে বসে একটি পরিকল্পনা তৈরি করুন। ভূমিকম্পের সময় কে কী করবে, কোথায় একত্রিত হবে, কার সাথে যোগাযোগ করবে – এসব বিষয় আগে থেকে ঠিক করে নিন।
3. **নিরাপদ স্থান চিহ্নিত করুন:** ঘরের মধ্যে কোথায় আশ্রয় নিলে তুলনামূলক নিরাপদ থাকবেন (যেমন – মজবুত টেবিল বা ডেস্কের নিচে), তা আগে থেকে চিহ্নিত করুন।
4. **ঝুঁকিপূর্ণ স্থান এড়িয়ে চলুন:** ঘরের মধ্যে যেসব স্থানে কাঁচের জানালা, ভারী আসবাবপত্র বা ঝুলে থাকা জিনিসপত্র আছে, সেগুলো থেকে দূরে থাকুন।
5. **ভারী আসবাবপত্র সুরক্ষিত করুন:** বুকশেলফ, আলমারি, রেফ্রিজারেটর ইত্যাদিকে দেয়ালের সাথে ভালোভাবে আটকে রাখুন, যাতে সেগুলো সহজে পড়ে না যায়।
6. **গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করার নিয়ম জানুন:** পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের শিখিয়ে দিন কীভাবে জরুরি অবস্থায় গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল সংযোগ বন্ধ করতে হয়।
7. **”ড্রপ, কভার, হোল্ড অন” অনুশীলন করুন:** পরিবারের সবাইকে শিখিয়ে দিন “Drop, Cover, Hold On” কৌশলটি। অর্থাৎ, ভূমিকম্প শুরু হলে দ্রুত নিচু হয়ে আশ্রয় নেওয়া এবং কম্পন না থামা পর্যন্ত শক্ত করে কোনো কিছু ধরে থাকা।
### ভূমিকম্প চলাকালীন: জীবন বাঁচানোর কৌশল
ভূমিকম্প শুরু হলে শান্ত থাকা এবং দ্রুত সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
**করণীয়:**
1. **নিচু হন, আশ্রয় নিন এবং ধরে থাকুন (Drop, Cover, Hold On):**
* **নিচু হন (Drop):** তৎক্ষণাৎ মেঝেতে বসে পড়ুন বা নিচু হয়ে যান।
* **আশ্রয় নিন (Cover):** মাথা ও ঘাড় দু’হাত দিয়ে ঢেকে নিন। সম্ভব হলে কোনো মজবুত টেবিল বা ডেস্কের নিচে আশ্রয় নিন।
* **ধরে থাকুন (Hold On):** কম্পন না থামা পর্যন্ত আশ্রয় নেওয়া বস্তুটিকে শক্ত করে ধরে থাকুন।
2. **ঘরের ভেতরে থাকলে:**
* ঘরের ভেতরেই থাকুন, বাইরে দৌড়ানোর চেষ্টা করবেন না।
* জানালা, কাঁচের দরজা, আলমারি, বুকশেলফ বা যেকোনো ভারী আসবাবপত্র থেকে দূরে থাকুন।
* বিছানায় থাকলে সেখানেই থাকুন, মাথা বালিশ দিয়ে ঢেকে নিন।
* বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট বা আগুন লাগার সম্ভাবনা থাকলে দ্রুত গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল সংযোগ বন্ধ করুন (যদি নিরাপদ থাকে)।
3. **ঘরের বাইরে থাকলে:**
* দ্রুত কোনো খোলা মাঠে বা উন্মুক্ত স্থানে চলে যান।
* বিল্ডিং, গাছ, বিদ্যুতের খুঁটি, তার বা যেকোনো উঁচু স্থাপনা থেকে দূরে থাকুন।
* মাটিতে নিচু হয়ে বসে পড়ুন এবং মাথা ও ঘাড় রক্ষা করুন।
4. **গাড়িতে থাকলে:**
* ধীরে ধীরে গাড়ি রাস্তার একপাশে নিরাপদ দূরত্বে থামান।
* ব্রিজ, ফ্লাইওভার, সুড়ঙ্গ বা উঁচু বিল্ডিং থেকে দূরে থাকুন।
* গাড়ির ভেতরেই থাকুন এবং সিটবেল্ট লাগিয়ে রাখুন। কম্পন না থামা পর্যন্ত অপেক্ষা করুন।
5. **হুইলচেয়ারে থাকলে:**
* চাকা লক করে নিন।
* মাথা ও ঘাড় ঢেকে নিন।
**করণীয় নয়:**
1. **আতঙ্কিত হবেন না:** শান্ত থাকার চেষ্টা করুন। আতঙ্কিত হলে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
2. **ভূমিকম্প চলাকালীন দৌড়াদৌড়ি করবেন না:** বিশেষ করে সিঁড়ি বা লিফট ব্যবহার করে নিচে নামার চেষ্টা করবেন না। এতে আঘাত লাগার সম্ভাবনা বাড়ে।
3. **লিফট ব্যবহার করবেন না:** বিদ্যুত্ চলে গেলে লিফটে আটকা পড়ার সম্ভাবনা থাকে।
4. **মোমবাতি, দেশলাই বা লাইটার জ্বালাবেন না:** গ্যাস লিক হয়ে থাকলে আগুন লাগার ভয় থাকে।
5. **ভেতরের দিকে হেলে থাকা দেয়ালের কাছে দাঁড়াবেন না:** এমন দেয়াল ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা বেশি।
### ভূমিকম্পের পর: করণীয় ও বর্জনীয়
কম্পন থেমে গেলেই বিপদ পুরোপুরি কেটে যায় না। আফটারশক এবং অন্যান্য ঝুঁকি মোকাবিলায় সচেতন থাকুন।
**করণীয়:**
1. **নিজেকে এবং অন্যদের পরীক্ষা করুন:** কোনো আঘাত পেয়েছেন কিনা পরীক্ষা করুন। অন্যদের সহায়তা করুন, তবে প্রয়োজনে পেশাদারদের জন্য অপেক্ষা করুন।
2. **আফটারশকের জন্য প্রস্তুত থাকুন:** বড় ভূমিকম্পের পর ছোট ছোট আফটারশক হতে পারে, যা আবার কম্পন সৃষ্টি করতে পারে।
3. **সাবধানে বাইরে বের হন:** যদি আপনার বিল্ডিং ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বাইরে বের হওয়া নিরাপদ মনে হয়, তবে ধীরেসুস্থে সিঁড়ি ব্যবহার করে বের হন। লিফট ব্যবহার করবেন না।
4. **পায়ে জুতা পরুন:** ভাঙা কাঁচ বা ধ্বংসাবশেষ থেকে পা রক্ষা করতে শক্ত জুতা পরুন।
5. **গ্যাস লিক পরীক্ষা করুন:** গ্যাসের গন্ধ পেলে বা হিসহিস শব্দ শুনলে দ্রুত জানালা খুলে দিন এবং বাড়ি থেকে বেরিয়ে নিরাপদ স্থানে যান। নিজে গ্যাস সংযোগ বন্ধ করতে যাবেন না, জরুরি সেবায় খবর দিন।
6. **বিদ্যুৎ সরবরাহ পরীক্ষা করুন:** তার ছিঁড়ে গেলে বা স্পার্ক দেখা গেলে বিদ্যুতের মূল সংযোগ বন্ধ করুন।
7. **রেডিও শুনুন:** ব্যাটারিচালিত রেডিওর মাধ্যমে জরুরি বার্তা এবং কর্তৃপক্ষের নির্দেশাবলী শুনুন।
8. **নির্ধারিত আশ্রয়কেন্দ্রে যান:** যদি আপনার বাড়ি গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং কর্তৃপক্ষের নির্দেশে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে হয়, তবে সেখানে যান।
**করণীয় নয়:**
1. **ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে প্রবেশ করবেন না:** যদি আপনার বাড়ি বা অন্য কোনো ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে কর্তৃপক্ষের সবুজ সংকেত ছাড়া সেখানে প্রবেশ করবেন না।
2. **গুজব ছড়াবেন না:** সঠিক তথ্য যাচাই না করে কোনো তথ্য বা গুজব ছড়ানো থেকে বিরত থাকুন।
3. **ছিঁড়ে যাওয়া বিদ্যুতের তার স্পর্শ করবেন না:** বিদ্যুতের তার বিপজ্জনক হতে পারে।
4. **অপ্রয়োজনে ফোন ব্যবহার করবেন না:** জরুরি সেবার জন্য ফোন লাইন চালু রাখুন। আত্মীয়স্বজনের সাথে যোগাযোগের জন্য মেসেজ ব্যবহার করুন।
5. **গ্যাস লিক হলে ইলেক্ট্রিক সুইচ অন বা অফ করবেন না:** এতে আগুন লেগে যেতে পারে।
### শেষ কথা
ভূমিকম্প এক কঠিন বাস্তবতাকে তুলে ধরে। এটি কখন আসবে তা আমরা জানি না, কিন্তু এর মোকাবিলায় আমরা কতটা প্রস্তুত, তা আমাদের জীবন বাঁচানোর জন্য অত্যন্ত জরুরি। আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকা, সঠিক প্রস্তুতি নেওয়া এবং দ্রুত ও কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া – এই তিনটি মূলমন্ত্র আপনাকে এবং আপনার পরিবারকে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করবে। আসুন, সবাই মিলে সচেতন থাকি এবং এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকি।
—



