## দিল্লির গৃহবধূ থেকে ক্ষমতার শিখরে: শেখ হাসিনার উত্থান ও পতন
ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু চরিত্র থাকে যাদের জীবন যেন এক মহাকাব্যিক আখ্যান। উত্থান, সংগ্রাম, ক্ষমতা, পতন—সবকিছু যেন এক সুতোয় গাঁথা। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে শেখ হাসিনা নিঃসন্দেহে এমনই এক আলোচিত ও সমালোচিত চরিত্র। তাকে নিয়ে যেমন রয়েছে অগণিত ভক্তের ভালোবাসা, তেমনি সমালোচকদের দৃষ্টিতে তিনি ফ্যাসিবাদী শাসনের প্রতিভূ। তার জীবনের বাঁকে বাঁকে জড়িয়ে আছে দিল্লী, যা ছিল তার রাজনৈতিক জীবনের সূতিকাগার এবং নিয়তির এক নির্মম পরিহাসে, তার জীবনের শেষ অধ্যায়ের নাটকীয় ঘোষণাটিও আসে সেই ভারতের মাটি থেকেই।
এই বিস্ময়কর উত্থান-পতনের ক্যানভাসে কিছু তারিখ ও ঘটনা শেখ হাসিনার জীবনকে নতুন মাত্রা দান করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং চমকপ্রদ হলো ১৭ নভেম্বর। ১৯৬৮ সালের এই দিনে তিনি পরমাণু বিজ্ঞানী ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। কে জানতো, তার ৫৮তম বিবাহ বার্ষিকীর দিনেই, অর্থাৎ ভবিষ্যতের এক ১৭ নভেম্বরে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দেবেন?
**দিল্লীর প্রবাস জীবন ও রাজনৈতিক অঙ্কুরোদ্গম**
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর শেখ হাসিনা তার বোন শেখ রেহানাসহ দীর্ঘ ছয় বছর ভারতের দিল্লীতে রাজনৈতিক আশ্রয়ে নির্বাসিত জীবন কাটান। এই সময়টি ছিল তার জীবনের এক গভীর সংকটকাল, যখন তিনি ছিলেন এক সাধারণ গৃহবধূ, স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে নির্জন প্রবাস জীবন যাপন করছিলেন। কিন্তু নিয়তির খেলা ছিল অন্যরকম। দিল্লীর এই প্রবাস জীবনই তার জন্য খুলে দেয় এক নতুন দ্বার।
১৯৮১ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি তারিখে, দিল্লীতে বসেই তিনি সর্বসম্মতিক্রমে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। এ ছিল এক অভাবনীয় ঘটনা। একজন গৃহবধূ, যিনি দীর্ঘকাল রাজনীতির মূল স্রোতধারা থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন, তিনিই হয়ে উঠলেন বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম ও ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলের কাণ্ডারি। এই নির্বাচন ছিল তার রাজনৈতিক জীবনের এক বাঁক বদলের মুহূর্ত। এরপরই তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পথ প্রশস্ত হয়। ১৯৮১ সালের ১৭ মে এক বিশাল জনসমুদ্রের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে তিনি দিল্লী থেকে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। সেদিন লাখো মানুষের ঢল নেমেছিল তাকে স্বাগত জানাতে, সেদিন অনেকেই দেখেছিলেন নতুন দিনের স্বপ্ন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আশা।
**ক্ষমতার শিখরে আরোহণ ও ফ্যাসিবাদী তকমা**
স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর শেখ হাসিনাকে পাড়ি দিতে হয়েছে দীর্ঘ ও বন্ধুর পথ। সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন, জেল-জুলুম, অসংখ্য বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে তিনি একসময় দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতার আসনে আসীন হন। দীর্ঘদিনের সংগ্রাম আর আপোসহীন মনোভাব তাকে নিয়ে যায় ক্ষমতার শিখরে। একাধিকবার তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং তার শাসনামলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছে।
কিন্তু ক্ষমতার এই দীর্ঘ যাত্রাপথেই সমালোচকরা তার দিকে ছুঁড়ে দিয়েছেন ‘ফ্যাসিবাদী’ তকমা। সমালোচকদের মতে, ক্ষমতা সুসংহত করার নামে তিনি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটিয়েছেন, বিরোধীদের কণ্ঠরোধ করেছেন এবং একনায়কতান্ত্রিক শাসন কায়েমের চেষ্টা করেছেন। গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণুতা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব করার অভিযোগ বারবারই তার সরকারের বিরুদ্ধে উঠেছে। গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতির অভিযোগ দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তাকে নিয়ে সমালোচনা সৃষ্টি করেছে। তার শাসনকালে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিভাজন আরও গভীর হয়েছে বলেও পর্যবেক্ষকরা মনে করেন।
**নিয়তির নির্মম পরিহাস: দিল্লীতেই পতন**
আর এখানেই আসে সেই নিয়তির নির্মম পরিহাসের চূড়ান্ত দৃশ্যপট। যে দিল্লী ছিল তার রাজনৈতিক পুনর্জন্মের কেন্দ্র, যেখান থেকে তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং পরে দেশে ফিরে ক্ষমতার সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করেছিলেন, সেই দিল্লীতে বসেই তাকে শুনতে হলো তার ৫৮তম বিবাহ বার্ষিকীর দিনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক ঘোষিত মৃত্যুদণ্ডের রায়। অর্থাৎ, তার রাজনৈতিক জীবনের শুরু হয়েছিল দিল্লীতে, আর তার রাজনৈতিক জীবনের সমাপ্তিও চিহ্নিত হলো দিল্লীতেই, এক চরম নাটকীয় এবং অপ্রত্যাশিত পন্থায়।
এ এক অবিশ্বাস্য ক্যানভাস। একজন সাধারণ গৃহবধূ থেকে দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী হওয়া, তারপর সমালোচকদের দৃষ্টিতে ‘ফ্যাসিবাদী’ তকমা নিয়ে, যেখান থেকে তার উত্থান, সেখানেই তার পতনের চরম ঘোষণা। শেখ হাসিনার জীবন যেন প্রমাণ করে, ক্ষমতার সিংহাসন এক মায়াবী হাতছানি, যা অনেক সময় ব্যক্তিজীবনকে এমন এক জায়গায় দাঁড় করায়, যেখানে তার শুরু আর শেষ মিলে যায় এক আশ্চার্যজনক সমাপতনে। এই উত্থান-পতন, সংগ্রাম আর শেষ বিন্দুর গল্প হয়তো ইতিহাসের নির্মম এক শিক্ষা হয়ে থাকবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে।



