## ট্রাম্পের অভিবাসন বন্ধের হুমকির পর বিতর্ক: কাদের ‘তৃতীয় বিশ্বের দেশ’ বলা হচ্ছে?
সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের একটি ঘোষণা বিশ্বজুড়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ওয়াশিংটনের হোয়াইট হাউসের কাছে দুই আফগান ন্যাশনাল গার্ড সৈন্যের গুলি চালানোর অভিযোগ ওঠার একদিন পর ট্রাম্প ‘তৃতীয় বিশ্বের দেশ’ থেকে অভিবাসন স্থগিত করার পরিকল্পনা করছেন বলে জানিয়েছেন। এই ঘোষণা কেবল অভিবাসনপ্রত্যাশীদের মধ্যেই নয়, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মধ্যেও তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। কিন্তু এই ‘তৃতীয় বিশ্বের দেশ’ বলতে ঠিক কাদের বোঝানো হচ্ছে? এবং কেন এই শব্দটি এখন এত বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে?
**ঘটনার সূত্রপাত এবং ট্রাম্পের ঘোষণা:**
হোয়াইট হাউসের অদূরে আফগান বংশোদ্ভূত দুই ন্যাশনাল গার্ড সদস্যের জড়িত থাকার অভিযোগে এই ঘটনা মার্কিন নিরাপত্তা ব্যবস্থায় উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায়, ট্রাম্প প্রশাসন দ্রুত অভিবাসন নীতির কড়াকড়ি আনার ঘোষণা দিয়েছে, যেখানে বিশেষ করে ‘তৃতীয় বিশ্বের দেশ’গুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। ট্রাম্পের মতে, এই দেশগুলো থেকে আসা অভিবাসীরা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তার এই পদক্ষেপকে অনেকে ‘জিরো টলারেন্স’ অভিবাসন নীতির আরও কঠোর সংস্করণ হিসেবে দেখছেন।
**’তৃতীয় বিশ্ব’ কী এবং কেন এই শব্দটি বিতর্কিত?**
‘তৃতীয় বিশ্ব’ শব্দটি মূলত স্নায়ুযুদ্ধকালীন একটি রাজনৈতিক বিভাজন থেকে এসেছে। সে সময় যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ‘প্রথম বিশ্ব’ এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তার মিত্রদের ‘দ্বিতীয় বিশ্ব’ বলা হতো। এর বাইরে থাকা জোটনিরপেক্ষ ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে ‘তৃতীয় বিশ্ব’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।
তবে, স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর এই শব্দটির প্রাসঙ্গিকতা অনেকটাই কমে গেছে। বর্তমানে এটি একটি সেকেলে, অপমানজনক এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতাকে ভুলভাবে উপস্থাপনকারী শব্দ হিসেবে বিবেচিত হয়। আধুনিক বিশ্বে দেশগুলোর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা অনেক জটিল এবং শুধুমাত্র এই তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা সম্ভব নয়। তাই, এর পরিবর্তে ‘উন্নয়নশীল দেশ’, ‘গ্লোবাল সাউথ’ বা ‘নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশ’ ইত্যাদি পরিভাষা ব্যবহার করা হয়।
**বিতর্কের মূল কারণ:**
ট্রাম্পের এই বিতর্কিত শব্দটি ব্যবহারের পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য স্পষ্ট। এটি সম্ভবত নিরাপত্তা ঝুঁকিকে কেন্দ্র করে অভিবাসীদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব তৈরি এবং তার সমর্থক গোষ্ঠীকে একত্রিত করার একটি প্রচেষ্টা।
* **বৈষম্যমূলক:** মানবাধিকার সংস্থাগুলো এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছে, এটিকে বৈষম্যমূলক এবং জেনোফোবিক বা বিদেশিদের প্রতি ঘৃণা ছড়ানোর একটি মাধ্যম হিসেবে অভিহিত করেছে। তাদের মতে, এটি নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠী বা অঞ্চলের মানুষের প্রতি এক ধরনের নেতিবাচক ধারণা তৈরি করে।
* **অগ্রহণযোগ্য পরিভাষা:** ‘তৃতীয় বিশ্ব’ শব্দটির ব্যবহার নিজেই একটি সমস্যা, কারণ এটি উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতি অবজ্ঞা ও অমর্যাদা প্রদর্শন করে। এই শব্দটি এমন এক ধারণার জন্ম দেয় যেখানে কিছু দেশকে জন্মগতভাবেই অন্যদের চেয়ে নিচু বা সমস্যাপূর্ণ বলে মনে করা হয়।
* **নীতিগত প্রভাব:** ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তে আফগানিস্তানের মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত এবং অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল দেশগুলো থেকে আসা অভিবাসনপ্রত্যাশীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, যেখানে মার্কিন নীতিই প্রায়শই অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। এই দেশগুলোর অনেক মানুষই যুদ্ধ, দারিদ্র্য এবং নিপীড়ন থেকে বাঁচতে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমাতে চায়।
**ভবিষ্যৎ প্রভাব ও আইনি চ্যালেঞ্জ:**
যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতিতে অতীতেও বিভিন্ন সময়ে নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠী বা অঞ্চলকে লক্ষ্য করে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে, যা পরবর্তীতে আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ট্রাম্পের নতুন ঘোষণাও সম্ভবত একই ধরনের আইনি লড়াইয়ের সম্মুখীন হতে পারে। এই ধরনের নীতি কেবল মানবিক সঙ্কটই বাড়ায় না, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ণ করে। এটি আমেরিকান সমাজের বৈচিত্র্য ও অর্থনীতিতে অভিবাসীদের অবদানকেও অস্বীকার করে।
**শেষ কথা:**
ট্রাম্পের ‘তৃতীয় বিশ্বের দেশ’ থেকে অভিবাসন স্থগিত করার হুমকি একটি গভীর বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এটি কেবল একটি নীতিগত বিতর্ক নয়, বরং একটি অগ্রহণযোগ্য শব্দ ব্যবহার করে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করার প্রচেষ্টা। বিশ্বব্যাপী সংঘাত, দারিদ্র্য এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যখন লক্ষ লক্ষ মানুষ নিজেদের ভিটেমাটি ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে, তখন এই ধরনের বিভেদ সৃষ্টিকারী rhetoric কেবল সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। সময় এসেছে এই শব্দবন্ধের আড়ালের প্রকৃত অর্থ এবং এর মানবতাবিরোধী প্রভাব নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করার।
—



