নিশ্চয়ই! জামায়াত আমিরের সাম্প্রতিক বক্তব্য নিয়ে একটি তথ্যবহুল ও বিশ্লেষণধর্মী ব্লগ পোস্ট নিচে দেওয়া হলো:
—
## জামায়াত আমিরের ‘পরামর্শ’: সাংবাদিকতার মেরুদণ্ড কতটুকু নমনীয় হবে?
সম্প্রতি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনা আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, তারা যেন জামায়াতের গঠনমূলক সমালোচনা করেন এবং ‘ওয়াচডগ’ হিসেবে তাদের ভূমিকা পালন করেন। এই বক্তব্য আপাতদৃষ্টিতে ইতিবাচক মনে হলেও, এর গভীরতা এবং অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। সাংবাদিকতার স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা এবং মেরুদণ্ড রক্ষার যে সুদীর্ঘ সংগ্রাম, এই ‘পরামর্শ’ সেখানে নতুন কোন চ্যালেঞ্জ যোগ করলো কিনা, তা ভেবে দেখার বিষয়।
**জামায়াত আমিরের আহ্বানটি কি এবং এর তাৎপর্য**
জামায়াত আমির সাংবাদিকদের বলেছেন যে, তারা যেন জামায়াতের সমালোচনামূলক দিকগুলো তুলে ধরেন এবং দলটির ভুলত্রুটি ধরিয়ে দেন। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, এটি জামায়াতকে সঠিক পথে চলতে সাহায্য করবে। যে দলটি দীর্ঘকাল ধরে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান এবং অতীত কর্মকাণ্ডের জন্য সমালোচিত, তাদের পক্ষ থেকে এমন একটি আহ্বান অবশ্যই কৌতূহলোদ্দীপক। বিশেষত, জামায়াত তাদের রাজনৈতিক দর্শনের কারণে দেশের একটি বৃহৎ অংশের মানুষের কাছে বিতর্কিত। একাত্তরের ভূমিকার জন্য বারবার সমালোচিত এই দলটি যখন নিজেদের সমালোচনার জন্য সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানায়, তখন এর পেছনের কারণ অনুসন্ধানের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।
**সাংবাদিকতার আদর্শ ভূমিকা: ওয়াচডগ কি কোনো দলের মুখাপেক্ষী?**
সাংবাদিকতা একটি সমাজের চতুর্থ স্তম্ভ। এর প্রধান কাজ হলো ক্ষমতাকে জবাবদিহির আওতায় আনা, অনিয়ম-দুর্নীতি প্রকাশ করা এবং জনমতকে সঠিক তথ্য দিয়ে পথ দেখানো। একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী গণমাধ্যম ছাড়া কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রই সফল হতে পারে না। গণমাধ্যম ‘ওয়াচডগ’ হিসেবে কাজ করবে, এটি কোনো রাজনৈতিক দলের ‘অনুরোধ’ বা ‘পরামর্শের’ উপর নির্ভরশীল নয়। সাংবাদিকতার মূল ভিত্তিই হলো নিরপেক্ষতা এবং নির্ভীকভাবে সত্য প্রকাশ করা, তা যে কোনো পক্ষের বিরুদ্ধেই যাক না কেন।
গণমাধ্যম কোনো নির্দিষ্ট দল বা ব্যক্তির সমালোচনা করার জন্য নয়, বরং সার্বিকভাবে জনস্বার্থ রক্ষায় সকল ক্ষমতার অপব্যবহারের উপর নজর রাখার জন্য কাজ করে। এই ভূমিকা পালন করতে গিয়ে সাংবাদিকদের প্রায়শই শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তি, অর্থনৈতিক স্বার্থান্বেষী মহল এবং এমনকি রাষ্ট্রীয় চাপ মোকাবিলা করতে হয়।
**জামায়াত আমিরের ‘পরামর্শ’কে কিভাবে দেখবো?**
এখন প্রশ্ন হলো, জামায়াত আমিরের এই ‘পরামর্শ’কে আমরা কিভাবে দেখবো?
1. **একটি ইতিবাচক পরিবর্তন? (তবে সংশয়ের সাথে):** কেউ কেউ হয়তো মনে করতে পারেন, এটি জামায়াতের পক্ষ থেকে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন, গণতন্ত্রের প্রতি তাদের নতুন অঙ্গীকারের ইঙ্গিত। একটি দল যদি সত্যিই নিজেদের অভ্যন্তরীণ সংস্কার চায়, তবে সমালোচনার দ্বার উন্মুক্ত করা ইতিবাচক হতে পারে। তবে, তাদের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস এবং বিভিন্ন বিতর্কিত পদক্ষেপ বিবেচনা করলে এই ভাবনা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
2. **কৌশলগত পদক্ষেপ?:** এর পেছনে কি কোনো কৌশলগত উদ্দেশ্য রয়েছে? জনসমক্ষে নিজেদের স্বচ্ছ প্রমাণ করার চেষ্টা, নাকি নিজেদের বিতর্কিত অতীত থেকে দৃষ্টি সরানোর একটি চতুর কৌশল? এমনও হতে পারে যে, জামায়াত এর মাধ্যমে নিজেদেরকে ‘গণতান্ত্রিক’ ও ‘সমালোচনা গ্রহণে সক্ষম’ হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইছে, যা তাদের জনসম্পর্ক উন্নত করতে সাহায্য করবে।
3. **সাংবাদিকতার স্বাধীনতার প্রশ্ন:** একটি দল যখন নিজেই সাংবাদিকদের ‘পরামর্শ’ দেয় কাকে সমালোচনা করতে হবে, তখন কি সাংবাদিকতার স্বাধীনতা কিছুটা হলেও ক্ষুণ্ণ হয় না? সাংবাদিকরা কোনো নির্দিষ্ট দলের ‘প্রাইভেট ওয়াচডগ’ নয়; এটি সমাজের ‘পাবলিক ওয়াচডগ’। তাদের কাজ শুধু জামায়াতের সমালোচনা করা নয়, বরং সকল রাজনৈতিক দল, সরকার, এবং ক্ষমতার সকল স্তরের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। সাংবাদিকদের সমালোচনার ক্ষেত্র রাজনৈতিক দলের নির্দেশনায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না।
**সাংবাদিকতার মেরুদণ্ড: নমনীয়তা বনাম দৃঢ়তা**
আমাদের শিরোনামের মূল প্রশ্নটি এখানেই। সাংবাদিকতার মেরুদণ্ড নমনীয়তা নয়, বরং দৃঢ়তা ও স্বাধীনতায় নিহিত। একজন সাংবাদিকের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সব ধরণের চাপ এবং প্রলোভন উপেক্ষা করে সত্য প্রকাশ করা। কোনো রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা অনুযায়ী কাজ করা একজন সত্যিকারের সাংবাদিকের পক্ষে সম্ভব নয়।
যদি সাংবাদিকতা কোনো দলের ‘পরামর্শ’ অনুযায়ী চলে, তবে তা তার বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে। সাংবাদিকদের প্রধান দায়িত্ব হলো তথ্য যাচাই করা, বিশ্লেষণ করা এবং নির্ভীকভাবে পরিবেশন করা। এই প্রক্রিয়ায় কোনো রাজনৈতিক দলের ‘আহ্বান’ বা ‘অনুরোধ’ তাদের কাজের দিকনির্দেশনা হতে পারে না।
**উপসংহার**
জামায়াত আমিরের এই ‘পরামর্শ’ নিঃসন্দেহে দেশের সাংবাদিক মহলে নতুন করে আলোচনার খোরাক যুগিয়েছে। তবে, এই আলোচনার মূল ফোকাস হওয়া উচিত সাংবাদিকতার মৌলিক নীতি, স্বাধীনতা এবং নিরপেক্ষতা কিভাবে অক্ষুণ্ণ রাখা যায়।
সাংবাদিকদের মনে রাখতে হবে, তাদের মেরুদণ্ড কোনো রাজনৈতিক দলের ইচ্ছা অনুযায়ী বাঁকানো যাবে না। তাদের দায়িত্ব সকল ক্ষমতার প্রতি নজর রাখা, এবং সত্যকে নির্দ্বিধায় তুলে ধরা – সে যে দলের বিরুদ্ধেই যাক না কেন। সাংবাদিকতার মেরুদণ্ড নমনীয়তার পরিবর্তে দৃঢ়তায় ঋজু থাকুক, এটাই কাম্য।
—



