## সমুদ্রের নিচে থাকা ‘মিসাইলের সুড়ঙ্গ’ উন্মোচন করল ইরান: মধ্যপ্রাচ্যে নতুন মেরুকরণ?
ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ যখন ক্রমশ বাড়ছে, ঠিক তখনই বিশ্বকে চমকে দিয়ে একটি চাঞ্চল্যকর ঘোষণা দিয়েছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান তীব্র উত্তেজনার মধ্যেই ইরান উন্মোচন করেছে সমুদ্রের নিচে থাকা এক বিশাল ‘ক্ষেপণাস্ত্র টানেল’ নেটওয়ার্ক। তেহরানের দাবি, এসব গোপন সুড়ঙ্গে মজুত রয়েছে শত শত দূরপাল্লার ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, যা যেকোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক এবং বিধ্বংসী জবাব দিতে সক্ষম। এই পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নতুন করে মেরুকরণ সৃষ্টি করতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।
**গভীরে লুকানো শক্তির বার্তা**
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম এবং বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই ক্ষেপণাস্ত্র টানেলগুলো পারস্য উপসাগরের গভীরে অত্যন্ত সুরক্ষিতভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এর মাধ্যমে ইরানের সামরিক সক্ষমতা একটি নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে, যা শত্রুপক্ষের জন্য সহজে শনাক্ত করা বা ধ্বংস করা প্রায় অসম্ভব। এসব টানেলে রক্ষিত দূরপাল্লার ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রগুলো যেকোনো লক্ষ্যবস্তুতে নির্ভুলভাবে আঘাত হানতে সক্ষম। ইরানের এই উন্মোচন শুধু নিজেদের প্রতিরক্ষাই নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
**মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বর্ধিত উত্তেজনা**
এই ক্ষেপণাস্ত্র টানেল উন্মোচনের সময়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বর্তমানে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি, আঞ্চলিক প্রভাব এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তেহরানের উত্তেজনা তুঙ্গে। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে ইরানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে, এবং উভয় দেশের মধ্যে সামরিক সংঘাতের আশঙ্কাও মাঝে মাঝে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে ইরানের এই পদক্ষেপ নিজেদের সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শনের একটি স্পষ্ট বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা শত্রুপক্ষকে যেকোনো আগ্রাসন থেকে বিরত রাখতে একটি শক্তিশালী প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করবে।
**হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিয়ে ইরানের হুঁশিয়ারি**
এই ঘোষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে ইরানের কড়া হুঁশিয়ারি। ইরান পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, যদি তাদের ওপর কোনো ধরনের সামরিক হামলা চালানো হয়, তাহলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই তেল পরিবহন রুট, হরমুজ প্রণালী নিরাপদ থাকবে না। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন হয়। ইরানের এই হুমকি বাস্তবায়িত হলে বিশ্ব অর্থনীতিতে এর ভয়াবহ প্রভাব পড়বে এবং জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইরানের সামরিক কর্মকর্তারা বারবার দাবি করে আসছেন, তাদের সামরিক সক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে আত্মরক্ষামূলক। কিন্তু এই ‘মিসাইল সুড়ঙ্গ’ উন্মোচনের মাধ্যমে তারা এই বার্তা দিতে চেয়েছেন যে, তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেবল স্থলভিত্তিক নয়, বরং সমুদ্রের গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত। এটি প্রমাণ করে যে, ইরান যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত এবং নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বদ্ধপরিকর।
**ভবিষ্যতের পথরেখা**
ইরানের এই সাহসী পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক মহলে গভীর আলোচনার জন্ম দেবে। এটি একদিকে যেমন তাদের সামরিক সক্ষমতা ও দৃঢ়তার প্রতীক, তেমনি অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতময় পরিবেশে নতুন করে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্র দেশগুলো এই পদক্ষেপকে কীভাবে দেখছে এবং এর প্রতিক্রিয়ায় কী ধরনের কৌশল গ্রহণ করে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে এটা স্পষ্ট যে, সমুদ্রের নিচে লুকিয়ে থাকা এই ‘মিসাইল সুড়ঙ্গ’ বিশ্ব ভূ-রাজনীতিতে ইরানের অবস্থানকে আরও দৃঢ় করেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।



