সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE) ইয়েমেন থেকে তাদের অবশিষ্ট সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে। গত মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) আমিরাতের পক্ষ থেকে এই গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা আসে, যা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এই সিদ্ধান্ত কেবল ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধেই নয়, বরং উপসাগরীয় অঞ্চলের দুই প্রভাবশালী শক্তি – সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও গভীর প্রভাব ফেলবে বলে মনে করা হচ্ছে।
**সৌদি আরবের আকস্মিক আল্টিমেটাম**
এই ঘোষণার পেছনে রয়েছে এক নাটকীয় ঘটনা। আমিরাতের সেনা প্রত্যাহারের ঠিক আগে সৌদি আরব সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাহিনীকে মাত্র ২৪ ঘন্টার মধ্যে ইয়েমেন ছেড়ে যাওয়ার আল্টিমেটাম দিয়েছিল। এই আকস্মিক এবং অপ্রত্যাশিত পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক মহলকে হতবাক করেছে। যাদেরকে একসময় ইয়েমেন যুদ্ধে অবিচ্ছেদ্য অংশীদার এবং মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরবের প্রধান মিত্র হিসেবে দেখা হতো, সেই দুই দেশের মধ্যে এমন সরাসরি সংঘাতের খবর উপসাগরীয় অঞ্চলে দীর্ঘদিনের সুপ্ত উত্তেজনাকে প্রকট করে তুলেছে।
**গভীর হচ্ছে সংকট: দুই উপসাগরীয় শক্তির ফাটল**
সৌদি আরবের এই আল্টিমেটাম এবং এর প্রতিক্রিয়ায় আমিরাতের সেনা প্রত্যাহার – এই দুটি ঘটনা উপসাগরীয় দুই শক্তি এবং বৃহৎ তেল উৎপাদনকারী দেশের মধ্যে এক গভীর সংকট নির্দেশ করে। দীর্ঘদিন ধরে ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটে সংযুক্ত আরব আমিরাত একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছিল। ২০১৫ সাল থেকে তারা হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছিল এবং দক্ষিণ ইয়েমেনে তাদের উল্লেখযোগ্য সামরিক উপস্থিতি ছিল। তারা সেখানে কিছু স্থানীয় মিলিশিয়া গ্রুপকেও সমর্থন দিয়ে আসছিল।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ফাটল কেবল ইয়েমেনের যুদ্ধের গতিপথই নয়, বরং বৃহত্তর আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্যেও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে। সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে সম্পর্ক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছুটা শীতল হয়ে আসছিল, বিশেষ করে ইয়েমেন যুদ্ধকে ঘিরে তাদের ভিন্ন কৌশলগত লক্ষ্যগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠার পর থেকে। আমিরাত নিজেদের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় আঞ্চলিকভাবে স্বাধীন ভূমিকা নেওয়ার চেষ্টা করছিল, যা অনেক সময় সৌদি আরবের ইচ্ছার সাথে সাংঘর্ষিক হয়েছে।
**ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ এবং আঞ্চলিক প্রভাব**
ইয়েমেন থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের এই প্রত্যাহার ইয়েমেনের যুদ্ধক্ষেত্রে এক বিরাট শূন্যতা তৈরি করবে। সৌদি আরবের উপর চাপ আরও বাড়াবে, কারণ তাদের এক শক্তিশালী মিত্র সরে দাঁড়ানোয় হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তারা আরও একা হয়ে পড়বে। এটি ইয়েমেনে মানবিক সংকটকেও নতুন মোড় দিতে পারে।
এই সংকট মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে। এই দুই প্রভাবশালী দেশের মধ্যে ফাটল ইরান-সৌদি আরবের চলমান ছায়া যুদ্ধের সমীকরণকেও জটিল করে তুলতে পারে এবং আঞ্চলিক জোটগুলোকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারে।
আগামী দিনগুলোতে এই সংকট কোন দিকে মোড় নেয় এবং এর আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রভাব কী হয়, সেদিকেই এখন সবার নজর।



