আয়াতুল্লাহ সৈয়দ আলী খামেনেয়ী ১৯৩৯ সালের ১৫ জুলাই মাশহাদ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। খামেনেয়ী ‘সৈয়দ’ খেতাব ধারণ করেন যা সরাসরি বংশানুক্রমে ইমাম আলী ইবনে আবু তালিব হতে পাওয়া। খামেনেয়ীর পূর্বপুরুষদের বেশিরভাগই বর্তমান ইরানের তাফরেজ থেকে আগত এবং তারা দেশান্তরিত হয়ে তাবরিজ শহরে বসবাস শুরু করেন।[৪৭] তার পিতার নাম সৈয়দ জওয়াদ খামেনেয়ী এবং মাতার নাম খাদিজা মিরদামাদী।[৪৮][৪৯] মা-বাবার আট সন্তানের মধ্যে খামেনেয়ী দ্বিতীয়, এর মধ্যে তার দুই ভাই-ই ধর্মগুরু। তার ছোট ভাই হাদী খামেনেয়ী একটি ইরানি সংবাদপত্রের সম্পাদক ও ধর্মগুরু।[৫০]
প্রথম বয়সে খামেনেয়ী তার গুরুগণ, যেমন: শেখ হাশেম কজভিনি এবং আয়াতুল্লাহ মিলানির কাছে ধর্মশিক্ষায় দীক্ষিত হন। ১৯৫৭ সালে মাশহাদ ত্যাগ করে তিনি বর্তমান ইরাকের শহর নাজাফের উদ্দেশে রওনা হন।[৫১] কিছু দিন নাজাফে থাকার পর তিনি কোম শহরে বসবাস শুরু করেন। সেখানে তিনি ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত ইসলামি সামরিক একাডেমিতে ধর্মতত্ত্ব শেখেন। এই সময় তার সতীর্থ ছিলেন রুহুল্লাহ খোমেনী। এরপরে তিনি ১৯৬৩ সালে ইসলামী কার্যকলাপের সাথে জড়িয়ে পড়েন এবং এর জন্য তাকে কারাবরণ করতে হয়। আলী খামেনেয়ী সোভিয়েত ইউনিয়নের পিপলস ফ্রেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটি অফ রাশিয়া থেকে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করেন,[৫২][৫৩][৫৪] যদিও এই বিষয়ে তার ওয়েবসাইটে কোনও কিছুর উল্লেখ নেই।[৫৫]
বর্তমান বিশ্বে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে শুধু একজন রাজনীতিক বা আলেম নয়, বরং মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশেষ করে ইসরায়েলের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তার একক অবস্থান এবং মুসলিম ঐক্যের পক্ষে জোরালো আহ্বান তাকে একটি অনন্য অবস্থানে নিয়ে গেছে।
আয়াতুল্লাহ খামেনি ১৯৩৯ সালের ১৭ জুলাই ইরানের পবিত্র শহর মাশহাদে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ছিলেন খ্যাতিমান শিয়া আলেম আয়াতুল্লাহ সৈয়েদ জাওয়াদ খামেনি। বহু সূত্র অনুযায়ী, খামেনি নিজেকে হোসাইনী সাইয়েদ বলে দাবি করেছেন, যার অর্থ—তিনি মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র ইমাম হোসাইন (রাঃ)-এর বংশধর।
ইরানের রাষ্ট্রীয় প্রকাশনা “Supreme Leader Ayatollah Khamenei Biography”-তেও এ দাবির সমর্থন পাওয়া যায়। যদিও আধুনিক ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে এর প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি, তথাপি ইসলামী ঐতিহ্য ও বংশতালিকার ভিত্তিতে এই পরিচয় মুসলিম বিশ্বে তার ধর্মীয় গ্রহণযোগ্যতা ও মর্যাদা আরও বৃদ্ধি করেছে।
খামেনির রাজনৈতিক উত্থান শুরু হয় ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে। তিনি ছিলেন ইমাম খোমেনির ঘনিষ্ঠ সহচর ও বিপ্লবের অন্যতম মুখ। বিপ্লবের পর তিনি ইরানের প্রথম আলেম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। পরে ১৯৮৯ সালে ইমাম খোমেনির মৃত্যুর পর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেন, এবং আজও সেই পদে অধিষ্ঠিত আছেন।
যদিও তিনি শিয়া আলেম, তবুও খামেনির ভাষণ ও দৃষ্টিভঙ্গিতে মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের প্রতি গুরুত্ব বারবার উঠে এসেছে। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, “শিয়া-সুন্নি বিভেদ ইসলামবিরোধী ষড়যন্ত্র।” ২০১০ সালে ইসলামী ঐক্য সম্মেলনে তিনি বলেন,
“আমাদের মধ্যে মিল বেশি, ফারাক নয়। শত্রুরা চায় বিভাজন।”
তিনি প্রায়শই সূরা আল ইমরান-এর ১০৩ নম্বর আয়াত উদ্ধৃত করেন: “তোমরা সবাই আল্লাহর রজ্জু দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং বিভক্ত হয়ো না।”
খামেনি বহুবার সৌদি আরব, মিশর, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন সুন্নি দেশের আলেমদের সঙ্গে সংলাপের আহ্বান জানিয়েছেন। আল-আলম, প্রেস টিভি এবং তেহরান টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, তিনি ফিলিস্তিনি প্রতিরোধকে সমর্থন জানিয়ে বলেন—
“আজ ফিলিস্তিনকে রক্ষা মানে ইসলামকে রক্ষা করা।”
২০১৪ সালে গাজার ওপর ইসরায়েলি আগ্রাসনের সময় তিনি প্রকাশ্যে হামাসসহ প্রতিরোধ যোদ্ধাদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন।
তবে খামেনির নেতৃত্ব সবসময় প্রশংসিত হয়নি। সৌদি আরব ও বাহরাইনের মতো সুন্নি নেতৃত্বাধীন দেশগুলো তাকে “শিয়া সম্প্রসারণবাদের” অভিযোগে অভিযুক্ত করে আসছে। পাশাপাশি ইরানের অভ্যন্তরে বিরোধীদের দমন, বাকস্বাধীনতা হরণ ও একক কর্তৃত্বের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
তবুও খামেনি বারবার জোর দিয়ে বলেছেন—“আমার লক্ষ্য শিয়া আধিপত্য নয়, বরং মুসলিম বিশ্বকে একত্রিত করা।”



